up

# সাইরু হিল রিসোর্ট

 

সাইরু নাম শুনলেই 'পিনন হাদি' পরা, চুলে বুনো ফুল গোঁজা, সারল্যে ভরা মিষ্টি চেহারার মেয়ের ছবি চোখে ভাসে। কিন্তু সাইরু হিল রিসোর্ট’ যে সাইরুর নামে, নামকরণ করা হয়েছে, সে কিন্তু পাহাড়ি ঝর্নার মতো উচ্ছল,চঞ্চল কোন মেয়ে নয়,এই সাইরু ছিলো এক অভিমানী রাজকন্যা। যে প্রেমিকের বিরহে আত্মাহুতি দিয়েছিল বলে জনশ্রুতি আছে।




সাইরু হিল রিসোর্ট এর কাছেই মুকুট পাহাড় নামে পরিচিত একটি জায়গায় দুটি গাছ রয়েছে যা সাইরু পয়েন্ট নামে পরিচিত।সাইরু ভিন্ন গোত্রের একজনকে ভালবেসেছিল কিন্তু ধর্মীয় রীতি ও সামাজিক আইন তাদের এক হতে দেয় নাই।তাই সাইরু পাহাড়ের খাদে আত্মাহুতি দেয়।আর তাদের ভালবাসার স্মৃতি বহন করে চলেছে আজও সেই পাহাড়।





রহস্যময় এবং অদ্ভুত এক অভিমানি প্রেমের বিষাদময় স্মৃতি ধরে রাখতে এ পাহাড় এবং রিসোর্টকে “সাইরু” নামকরণ করা হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের সিইও রেজাউর রহমান রেজা এবং পরিচালক এথেন্স ম্রো। রিসোর্টে ঢুকলে রিসিপসানের দেয়ালে সবার আগে নজরে পড়বে বিষাদময় এই প্রেমকাহিনী।





১৩টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বর্ণময় কৃষ্ঠি,সংস্কৃতি, তাদের জীবনাচার,পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এঁকেবেঁকে বয়ে চলা চঞ্চলা নদী সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সবুজের মেলা আর বয়ে চলা পাহাড়ি র্ঝনার এমন নয়নাভিরাম প্রাকৃতির সৌন্দর্যের কারণে পর্যটকদের কাছে বান্দরবন সবসময়ই বাংলাদেশের হিল স্বর্গ।আর বান্দরবনে বেড়াতে আসা মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রিসোর্টের মধ্যে 'নীলগিরি'র পরেই সাইরু', প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিচারে.বান্দরবন শহর থেকে প্রায় 19 কি.মিদূরে নীলগিরি রোডে ওয়াই জংশন আর্মি ক্যাম্পের পাশেই নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর অনিন্দ্য সুন্দর এই রিসোর্টটি।



আনুষঙ্গিকতা
 সেরে আমরা রুমে যাওয়ার জন্য উপরের দিকে উঠতে লাগলাম 4/5 তলার মতো উপরে আমাদের রুম। যত উঁচুতে তত সুন্দর ভিউ।রাস্তায় ক্লান্তিতে একটু আগের বিরক্তি মাখা চেহারা মুহূর্তে প্রশান্তির আবেশে উদ্ভাসিত।চারদিকে সবুজ আর সবুজ,বাতাসে যেন গাছের পাতায় সুর তুলেছে সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ১৮শ ফুট উঁচুতে পাহাড় চূড়ায়।এই রিসোর্ট  বাংলাদেশে আমার থাকা সবচেয়ে উঁচু রিসোর্ট এটিহেঁটে উঠতে আমার কষ্ট না হলেওকারো কারো কষ্ট হবে তবে রুমের দরজা খুলে দেয়ার পর রুম ভিউবিশেষ করে টেরেস দেখে আমি মুগ্ধ,এখানে মোট চার ধরনের 29টি রুম ছিল। আমাদের রুমটি ছিল 'প্রিমিয়াম'





রিসোর্টের অবকাঠামোতে যেমন নান্দনিক স্থাপত্যশৈলির সমাবেশ ছিল, তেমনি রুমের অন্দরসজ্জায়ও ছিল নান্দনিকতা,আরামদায়ক অবকাশ যাপনের জন্য আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিলাসবহুল এই রিসোর্টটি।রিসোর্টের অন্যতম স্বতন্ত্র দুইটি বৈশিষ্ট হল রুমের সাথে খোলামেলা টেরেস আর ইউনিক ডিজাইনের বাথটাব সহ কাঁচ দেয়া সুবিশাল আধুনিক বাথরুম।যা যে কারো রোমান্টিক মুড তৈরি করার জন্য সত্যিই অতুলনীয়।





আমার প্রথম দিনের বিকালটা পাহাড়ের ফাঁকে আটকে থাকা তুলার মতো মেঘ আর চারপাশের সবুজের সারি দেখে
কেটে গেল।যদিও বই নিয়েই দুই চেয়ার মিলিয়ে আরাম করে বসে ছিলাম, পড়বো বলে;এক দুই লাইন পড়েছি বলেও মনে হয় না। কারন কে চোখের সামনে ভেসে বেড়ানো মেঘের আনাগোনা না দেখে বইয়ে চোখ ডুবিয়ে রাখতে পারবে? দিগন্ত রেখায় যখন লাল, কমলা, কালো,নীল রং প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছিল একটিকে হারিয়ে অন্যটি উজ্জ্বল হওয়ার জন্য তখন আমি আর চেয়ারে বসে না থেকে কফির মগ নিয়ে রেলিং এ টেস দিয়ে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে দেখছিলাম ছিলাম।কতকাল আকাশের এতরঙ এমন কম্পোট জোনে বসে দেখা হয়নি।





রাতের খারাব খেতে নীচের রেস্টুরেন্টে যেতে বের হয়ে, মনে হলো চারিদিক কুয়াশার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে কেউ।একটু দূরের কিছুও দেখা যায় না; এছাড়াও অদ্ভুত কিছু পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার গান আর নাম না জানা পাখির অদ্ভুত ডাক, সাথে শিউলি,জেসমিন ফুলের মনমাতানো গন্ধে পুরো রিসোর্টের রাতের পরিবেশকে মোহনীয় করে তুলেছে।এমন চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশ সিঁড়িভাঙার কষ্টকে বেমালুম ভুলিয়ে দিবে।








তবে যাওয়া আসার পথে খেয়াল করলাম আলো স্বল্পতায় সিঁড়ি বা আশপাশ ভালো করে দেখা যায় না।এমন পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশে সাপ বা অন্যান্য প্রাণীর ভয় থাকে। তাই পর্যাপ্ত আলোর প্রয়োজন ছিল। এছাড়া রাতে আমি কোন নিরাপত্তা কর্মী দেখিনি দায়িত্বরত।তাই ইচ্ছে থাকা শর্তেও একা বাহিরে হাঁটিনি।আমার মতে, মনে ভয় নিয়ে রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় না।





আমার অভ্যাস মতো জগিং জন্য ভোরে উঠে পুরো রিসোর্ট চক্কর দিয়ে এসে কফির মগ হাতে নিয়ে রিসোর্টের বারান্দায় বসে মনে হলো, পাহাড়ের ভাঁজে আটকে আছে তুলার মতো ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের টুকরা;আর পাহাড় গুলো একের পিঠে এক যেন সারিবদ্ধভাবে সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে সাজিয়েছেন পাহাড়, আকাশ, মেঘ মিলে নান্দনিক ভঙ্গিমায় যেন সেজেছে প্রকৃতি।যা একই সঙ্গে চোখ আর মনের প্রশান্তি এনে দেয়।








কারো কারো মতে শরৎকাল হলো সাইরু হিল রিসোর্ট ভ্রমণের উপযুক্ত সময়।আবার কেউ বলে শীতকাল।তখন নাকি সকালের ঘুম ভেঙে বিছানায় বসেই দেখা যাবে টেরেসের দরজায় একটুকরো শুভ্র মেঘ লুটোপুটি খাচ্ছে। দরজা মেললেই তাদের সাথে হবে আলিঙ্গন এবং পুরো রুম জুড়েই মেঘদলের সাথে বসবাস।কিন্তু বাস্তবতা হলো আমি জানুয়ারি মাসের শৈত্য প্রবাহের ভিতর গিয়েও এমন দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার কাছে সকালের সূর্যাদয়ের সময় মনে হয়েছে দূরের পাহাড়গুলোকে কে যেন শুভ্রতুলোর রাশিরাশি পেঁজ এনে ঢেকে দিয়েছে;শুভ্র মেঘের চাদরে জড়িয়ে থাকা প্রকৃতির উপর সূর্যের স্নিগ্ধ কোমল আলো অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করেছিল;তবে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে ভোরে আপনাকে যেতে হবে রেস্টুরেন্টের টেরেসে বা রিসোর্টের লাষ্ট পয়েন্টর কোনায়।





তবে যারা আমার মতো যারা বৃষ্টি বিলাসী, মেঘ বা মেঘলা আকাশ ভালোবাসেন, তাদের জন্য অবশ্যই সাইরুতে বেড়ানোর সেরা সময় বর্ষাকাল;কারন বর্ষায় পাহাড়ি প্রকৃতি ফিরে পায় সতেজতা, চারিদিকে থাকে সবুজের সমারোহ।পাহাড়ি ছোট ছোট ঝর্নাও প্রাণ পায়।





আমরা দুপরবেলাটা রেখেছিলাম সুইমিং এর জন্য;রিসোর্টের সবচেয়ে উপরের অংশে রয়েছে অসাধারণ এক ইনফিনিটি সুইমিংপুল;যা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ১৮০০ ফুট উপরপুলের কিনারে দাঁড়ালে দিগন্ত জুড়ে ঢেউ খেলা পাহাড়ের ভাঁজ ও শুভ্র মেঘের সমুদ্র দেখা যায়।এমন শ্বেতশুভ্র মেঘের আনাগোনা দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটার খবর থাকবে না, স্টোমাক বিদ্রোহ করা পর্যন্ত।





রিসোর্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থাপনা হল রিসিপসান সহ রেস্টুরেন্ট;নান্দনিক এই রেস্টুরেন্টের ওপেন টেরেসের অংশ হলো টুরিস্টদের ফটোসেশনের অন্যতম জায়গা;বেতের দোলনা, কাঠের সিঁড়ি, গাছের গুড়িতে বসার জায়গা, পারুল- বাগান বিলাস ফুলের ঝাঁড়,জলাধার সব মিলিয়ে চমৎকার করে সাজিয়ে ফটোজনিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।আর পাহাড়ি প্রকৃতির অতুলনীয় সৌন্দর্য তো সদা প্রস্তুত ফটোসেশনের জন্য।





চমৎকার এই রেস্টুরেন্টে বসে পাহাড়ি খাবারের স্বাদ নিতে সবার ইচ্ছে হলেও, সুযোগ নাই;ওদের পাহাড়ি আইটেম হল একমাত্র ব্যম্বুচিকেন।তবে ৭ ধরনের স্ন্যাক্স,৫ ধরনের স্যুপ, চাইনিজ, দেশী খাবার(খিচুড়ি/বিরিয়ানি) বারবি কিউ আইটেম,বিভিন্ন ধরনের বেভারেজ আইটেম ও সিজনাল জুস ছিল তবে খাবারের দাম অনেক বেশী;আমাদের দেশের প্রতিটি রিসোর্টই এমন গলা কাটা দাম রাখে, অতিথির বিকল্প সুযোগ নেই জেনে।এটা মেনে নিতে হবে।








সাইরু থেকে খুব সহজে ঘুরে আসা যায় নীলগিরি, চিম্বুক, শৈল প্রপাত, মেঘলা, নীলাচল,কিংবদন্তীর বগা লে স্ মন্দির একটু দুরে, শহরের দিকে।ফেরার দিন খানিকটা সময় হাতে নিয়ে রেব হলে মন্দিরটা দেখে ফেরা যায় এছাড়া সাংগু নদীতে নৌ ভ্রমণ করা যায়।সেক্ষেত্রে অবশ্য ২/৩ টি ঝর্ণার দেখা মিলবে, তার মধ্যে রয়েছে বান্দরনী এবং স্রোতস্বিনী ঝর্ণা। তবে সেটা বর্ষা হতে হবে।আমরা আরো দুই বার বান্দরবন গিয়েছিলাম, তাই এবার কোথাও যাইনি। চারদিনই পরিপূর্ণ অবকাশ যাপন করেছি।








শান্ত সবুজ প্রকৃতির সান্নিধ্যে নগর জীবনের ক্লান্তি ঘুচাতে আধুনিক বিলাসবহুল এই রিসোর্ট অনন্য।তবে আমার কাছে মনে হয়েছে আতিথেয়তার মান, কর্মী সংখ্যা এবং নিরাপত্তা আরো উন্নত করা উচিৎ।কারন এমন একটা লাক্সারি রিসোর্টে রুম সার্ভিসে কল করলে 45/50 মিনিট লাগা উচিৎ নয় রেসপন্স করতে।তাছাড়া রুমে ফুড সার্ভিস থাকা উচিৎ। কারন অনেকেরই এত সিঁড়ি ভেঙে প্রতিবেলা নীচে গিয়ে খাবার খেতে যেতে ইচ্ছে করে না।আর অতিথিদের যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করা উচিৎ, এখন শুধু মালপত্র নেয়া আনা করে গাড়ীতে। বিশেষ করে শারীরিক সমস্যা বা বয়স্কদের বেশ কষ্ট হয় হেঁটে উঠতে।




এসব সীমাবদ্ধতা বাদ দিলে রিসোর্টের নান্দনিক ডিজাইন এবং প্রকৃতিক পরিবেশ সবকিছুই যে কারো সময়কে উপভোগ্য করে তুলবে।

কিভাবে যাবেন:
সাইরু হিল রিসোর্টে বান্দরবন থেকে যেতে হয়।বিভিন্ন বড় জেলা শহর থেকে বান্দরবনের বাস পাওয়া যায়।এছাড়া ট্রেনেও যাওয়া যায় চট্টগ্রাম পর্যন্ত। তারপর লোকাল বাসে বান্দরবন।সেখান থেকে চাঁদের গাড়ী বা মাইক্রোবাসে রিসোর্ট যাওয়া যায়।সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। 2000-2500 টাকা নেয়।

খরচ:

সাইরু রিসোর্টে ৪ ধরণের মোট ২০ টি কটেজ রয়েছে। 

প্রিমিয়াম খরচ ১৬০০০ টাকা।প্রাপ্ত বয়স্ক ২ জনের জন্য হলেও অনুর্ধ ৮ বছর বয়সি ২ টি বাচ্চা সহ থাকা যাবে। এক্সট্রা একটা বেড খরচ পড়বে ১৫০০ টাকা।

এক্সিকিউটিভ রুম ১৪০০০ টাকা। ২ জন এবং  অনুর্ধ ৮ বছর বয়সি ২ টি বাচ্চা সহ থাকা যাবে।

  সাঙ্গু ভিউ উইদ ট্যারেস রুম ১২০০০ টাকা

সাঙ্গু ভিউ রুম ১০,০০০ টাকা।

ডরমিটরি কটেজ রুমে ২৫০০০ টাকায় ১০ জন থাকা যায়।বাজেট গ্রুপ ট্যুর করলে এটা মন্দ নয়।










একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Ads Inside every post